নিজেস্ব প্রতিনিধি:
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় পদ্মা নদীর তলদেশ টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন করে অবৈধ ভাবে ও অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছে থেকে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এক লক্ষাধিক বেশি মানুষের বসতভিটা হুমকির মুখে পড়েছে পদ্মার ডানতীর ও বাম তীর রক্ষা বাধ সহ।
স্থানীয়দের ও গণমাধ্যমের ধারণা স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আঁতাত করে দীর্ঘদিন যাবত সুরেশ্বর নদী থেকে মাটি উত্তোলন করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দিন-রাত ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি ডান তীর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নড়িয়া পৌরসভা, চররাত্রা, নওপাড়া, ঘড়িশার ও মোক্তারের চর সহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানা গেছে, অতীতে ভয়াবহ নদীভাঙন থেকে এলাকা রক্ষায় সরকার বিপুল ব্যয়ে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু বর্তমানে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সেই বাঁধও নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের একটি অংশের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের আঁতাতের কারণে প্রকাশ্যে এভাবে বালু উত্তোলন চলছে। গত বছর পদ্মা সেতু এলাকার জিরো পয়েন্টে ভয়াবহ নদী ভাঙ্গন চলছে। সেই সময় ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন অন্তবর্তী কালীন সরকারের উপদেষ্টা ফাইজুল কবির। পদ্মা নদীর ভয়াবহ নদী ভাঙ্গনের কারণে পদ্মা নদী থেকে বালু না কাটার জন্য নির্দেশ দেন শরীয়তপুরের ডিসিকে। তারপর থেকে নদী থেকে মাটি উত্তোলন বন্ধ হয়। গত দুই তিন সপ্তাহ যাবত পুনরায় নড়িয়ার পদ্মা নদী থেকে ৫০ থেকে ৬০ টি কাটার দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন ধারাবাহিক ভাবে চলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগামী দিনে ভয়াবহ ভাঙনের আশঙ্কা করছি। শুধু বসতভিটাই নয়, নদী রক্ষা বাঁধও হুমকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, চরআত্রা, নওয়াপাড়া, সুরেশ্বর, কেদারপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমতাবস্থায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা বলেন, অতীতে একাধিকবার নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়েছেন তারা। নতুন করে বালু উত্তোলনের কারণে আবারও আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের সবার।
সরজমিনে নদীতে গিয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রিক মিডিয়া ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা তাদেরকে ঘিরে ফেলে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে নিষেধ করেন। একটি স্পিডবোট ও চার পাঁচটি টলার নিয়ে তাদের চার পাশে মহড়া দেন ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। এবং তারা বলে আপনাদের কোন কিছু জিজ্ঞেস করা থাকলে উপজেলা প্রশাসন ও ঠিকাদার ফরিদ আহমেদ রয়েল মাঝির সাথে কথা বলেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ফরিদ আহাম্মেদ রয়েল মাঝি। তিনি বলেন, নির্ধারিত স্থান থেকেই নিয়ম অনুযায়ী বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য চ্যানেল কার্ড হচ্ছে জায়গাটা উচ্চ হওয়ার কারণে নদী থেকে বালু কাটা হচ্ছে। তবে দৈনিক কত ঘনফিট বালু উত্তোলন করা হয় সেটা তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি। তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন মহোদয় বিষয়টি অবগত আছেন। আমি নিয়ম মেনেই ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছি। তবে উচ্চ স্তরে যেতে নদীর মাঝখান থেকে বালু কেটে বালুর স্টক থেকে বালু উত্তোলন করা হবে।
নদীর গতিপথ ঠিক রেখেই বালু উত্তোলন করছি। এতে বাধের ও স্থানীয় লোকজনের কোন ক্ষতি হবে না।
এ বিষয়ে নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। নির্ধারিত স্থানের বাইরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসন জানায় পর্যাপ্ত লোকবল না থাকার কারণে পদ্মা নদী থেকে কি পরিমান বালু কাটা হয়েছে তা তারা জানেন না।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল কাইয়ুম খান বলেন, পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য নীতিমালা অনুযায়ী রয়েল মাঝি নামের এক ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়মবহির্ভূত ভাবে বালু উত্তোলন করা হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা নির্ধারিত বালু স্টক থেকেই আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছি। এছাড়া একটি মহলের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে যথা সময়ে।