
স্টাফ রিপোর্টার
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার রশুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক নির্যাতন, শৃঙ্খলার অবনতি এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ঘর ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রাইভেট ও কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করছেন। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের নিজেদের কাছে প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করেন। অনেক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে পড়ার ব্যবস্থা করা হয় বলেও দাবি করেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের বাইরে অন্য শিক্ষকের কাছে পড়তে চাইলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সাইজুদ্দিন কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া সহকারী শিক্ষক নিপু, হামজাল, দিশা, জাকির, কমল, শারমিন, লিটন, মুসলিম, সুজিত ও সাইফুলের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রাইভেটে পড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব শিক্ষক বিদ্যালয়ের আশপাশে ভাড়া করা বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান।
এছাড়া বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক শীতলের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের দাবি, তিনি আইসিটি বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষ নন। তাঁকে একটি আবেদনপত্র কম্পিউটারে টাইপ করতে বলা হলে তিনি তা পারবেন না বলেও অভিযোগ তোলা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ, ক্লাসে পড়া না পারলে বা ভুল করলে কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে শাস্তি দেন। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষার মানের অবনতির কারণে সাম্প্রতিক একটি পরীক্ষায় ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৪ জন অকৃতকার্য হয়েছে। এর দায়ভার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলেও প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জামের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম আপ্যায়নের ব্যবস্থাও থাকে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের ভবনের দেয়ালে বিভিন্ন লেখা আঁকার ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে বিষয়টি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত দেয়াল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, কোনো শিক্ষার্থী কয়েকদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তাদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায় করা হয়। অথচ এ ধরনের অর্থ আদায়ের কোনো বৈধতা নেই। এ টাকা শিক্ষকরা নিজেদের পকেট ভরেন বলেও অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন এক শিক্ষক মুঠোফোনে বলেন, “ভাগ করে নিয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। আমি যে এলাকায় থাকি, ওই এলাকার শিক্ষার্থীরা তো স্বাভাবিকভাবেই আমার কাছেই পড়বে। জোরপূর্বক ওটা আর কী! কিছু কিছু হয়তো দুই একটি আপনি পাবেন, কিন্তু ওরকম ঢালাওভাবে পাবেন না। আগে স্কুলের ভেতরে কোচিং থাকলেও প্রধান শিক্ষক বলেছেন, স্কুলের ভেতরে কোচিং হবে না। যারা কোচিং করাবেন, তারা তাদের নিজ নিজ দায়িত্বেই করাবেন। তাই যার যার এলাকায় নিজ দায়িত্বে কোচিং করান।”
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সাইজুদ্দিনকে কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সরাসরি কোনো সদুত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং ফোনে এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় তিনি বলেন, “শোনেন, ফোনে তো এগুলো বলা যায় না, আপনারা আসেন। এরপর কথা বলি।” শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে বাধ্য করার বিষয়ে জানতে চাইলে তখন তিনি কথা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে ইংরেজিতে বলেন,
“You will talk with Headmaster about coaching, okay?” (কোচিংয়ের বিষয়ে হেডমাস্টারের সঙ্গে কথা বলুন, ঠিক আছে?)
“I don’t care. I don’t care anything. Okay?” (আমি এসবের পরোয়া করি না। কোনো কিছুরই পরোয়া করি না। ঠিক আছে?)
“Headmaster looks after everything.” (হেডমাস্টার সবকিছু দেখভাল করেন।)
এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
প্রধান শিক্ষক আফজাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাইরে কোচিং করাচ্ছেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তবে কাউকে বাধ্য করা বা নির্দিষ্ট সংখ্যায় শিক্ষার্থীকে কোচিং করানোর দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। শিক্ষকরা লিখিত দিয়েছেন যে, বাইরে পড়ানোর ক্ষেত্রে যেকোনো দায়ভার তাদের নিজেদের। সহকারী প্রধান শিক্ষক সাইজুদ্দিন কোচিং করানোর বিষয়টি একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো প্রকার মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তাঁর কাছে আসেনি এবং কেউ কোনো অভিযোগও দেয়নি। তিনি স্কুলে আসার পর থেকে সরকারিভাবে কোনো খেলার সরঞ্জাম পাননি। ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি বল দিলেও অন্য কেউ কোনো সহায়তা করেনি। নির্বাচন ও রমজানের কারণে এবার কিছুটা ঝামেলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে চায় না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে ও তাদের মনোযোগ কমছে, তাই তারা অকৃতকার্য হয়েছে। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে জরিমানা নেওয়ার নিয়ম সব জায়গাতেই আছে এবং এখানেও নেওয়া হয়। তবে এই টাকা শিক্ষকদের পকেটে যাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ধনী পরিবারের সন্তানরা ড্রেস ছাড়া আসার বিষয়টি প্রতিদিনই বলা হয়, কিন্তু কাজ হয় না। তাঁর মতে, বিদ্যালয় সম্পূর্ণ সঠিকভাবে এবং নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী এবং বর্তমান অভিভাবকদের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষক আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে অপেশাদার ও অশোভন আচরণ, তুচ্ছ কারণে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়ে ভীতি প্রদর্শন, ম্যানেজিং কমিটিকে তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে বিদ্যালয়ের তহবিল তছরুপ এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরির অভিযোগ এনে মুন্সীগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এ বিষয়ে সিরাজদিখান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুন নাহার বলেন, উপজেলার প্রায় সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই কমবেশি কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে শিক্ষা বিভাগ তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। রশুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে এবং বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনিক বা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা শিক্ষা বিভাগের হাতে না থাকলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরীক্ষা কমিটির প্রধান এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দায়িত্বেও রয়েছেন। তাঁর নির্দেশনায় চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় রশুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশ্নপত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। শিক্ষা বিভাগ শিক্ষকদের কাছ থেকে খসড়া প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা পরিমার্জন ও মডারেশন করে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র সরবরাহ করছে। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে পড়ান, সেসব বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, যাতে কোনো শিক্ষক আগাম প্রশ্ন ফাঁস বা কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ না পান।
কামরুন নাহার আরও বলেন, সিরাজদিখানের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বাইরে থেকে কেনা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গাইড প্রকাশনী ও প্রশ্ন সরবরাহকারী একটি ব্যবসায়ী চক্রের কারণে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ কারণে শিক্ষা বিভাগ নিজস্ব তদারকির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র প্রস্তুতের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ পায়।
তিনি জানান, এবার সব বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিজেদের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত করা সম্ভব না হলেও আগামী বার্ষিক পরীক্ষায় সব বিষয়ের প্রশ্ন একই পদ্ধতিতে শিক্ষা বিভাগের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুম্পা ঘোষ বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ার আগে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চাই। ওই এলাকার অভিভাবকদের পক্ষ থেকে আমাকে একটি লিখিত অভিযোগ দিন। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”