
নিজস্ব প্রতিবেদন
মুন্সীগঞ্জে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তনের ফলে নতুন করে নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে পদ্মার পুরোনো শাখা নদীর একটি অংশ এখন মূল চ্যানেলে পরিণত হওয়ায় নদীর তীব্র স্রোত সরাসরি আঘাত হানছে তীরবর্তী এলাকায়। এর ফলে সদর উপজেলার শিলই, বাংলাবাজার এবং লৌহজং উপজেলার গাওঁদিয়া এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি, সরিষাবন ও সাথকচর এলাকাও ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে লৌহজং উপজেলার গাওঁদিয়া এলাকায়। এখানে পদ্মার শাখা নদী বর্তমানে মূল চ্যানেলে রূপ নেওয়ায় প্রায় ৫০০ মিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙন ঠেকাতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলেছে।
পাউবো সূত্র জানায়, গাওঁদিয়া এলাকায় স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্রায় ২০০ মিটার অংশে ব্লক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আকস্মিক এই ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার তাদের বসতবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। পরে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে নতুন নির্মিত বাঁধে এত দ্রুত ভাঙন দেখা দেওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপে দেখা গেছে, ভাঙনস্থলে নদীর গভীরতা প্রায় ২৫ মিটার, যা প্রকল্পের নকশা তৈরির সময়ের তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার মূল চ্যানেল গাওঁদিয়া বাজারের দিকে সরে আসায় নদীর তলদেশে গভীর স্কাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এতে নদীর তলদেশ নিচে নেমে যাচ্ছে এবং তীরের নিচের মাটি ধসে পড়ায় ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মুন্সীগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিল জানান, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৯ দশমিক ১০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৬ দশমিক ৩৬০ কিলোমিটার সতর্কমূলক প্রতিরক্ষা এবং ৫ দশমিক ০৯০ কিলোমিটার শক্তিশালীকরণ কাজ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, গাওঁদিয়া এলাকায় ৫০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ চলমান থাকলেও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের সময় যে অংশটি পদ্মার শাখা চ্যানেল ছিল, বর্তমানে সেটিই মূল চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। ফলে ওই এলাকায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ভাঙন বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, পদ্মার সর্বশেষ হাইড্রোলিক ও মরফোলজিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাঁধের নকশা নিয়মিত পর্যালোচনা না করলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বৈঠক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
অন্যদিকে, সদর উপজেলার শিলই ও বাংলাবাজার এলাকাতেও পদ্মার গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নদীর মূল চ্যানেল এখন এসব এলাকার খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় শম্ভুহালদার কান্দি, সরকারকান্দি, বানিয়াল ও মহেষপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে পদ্মার চ্যানেল ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে শিলই-বাংলাবাজারের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ২০১৫ সালের পর মূল চ্যানেল তীরের আরও কাছে চলে আসে। এর ফলে নদীর তলদেশে গভীর স্কাওয়ার সৃষ্টি হয়ে তীরের নিচের মাটি সরে যেতে থাকে এবং ভাঙনের মাত্রা বাড়ে। ২০২০ সালে ভয়াবহ ভাঙনে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়।
চলতি বর্ষা মৌসুমেও শিলই ও বাংলাবাজার এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাউবো জিওব্যাগ ফেলে জরুরি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানান, শিলই ইউনিয়নের পূর্বরাখী এলাকায় ১২ হাজার জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। এছাড়া শম্ভুহালদারকান্দি এলাকায় ১৮ হাজার জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে।
এদিকে, টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের কান্দারবাড়ি, সরিষাবন ও সাথকচর এলাকাতেও পদ্মার গতিপথ পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। নদীর স্রোতের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব এলাকার তীররক্ষা এবং জনবসতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।